শেষ ট্রেনের যাত্রী | Passengers on the last train

 শেষ ট্রেনের যাত্রী

 


রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। শহরের সবচেয়ে পুরোনো রেলস্টেশনটি ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছিল। একসময় যেখানে মানুষের ভিড়ে দাঁড়ানোর জায়গা থাকত না, এখন সেখানে শুধু বাতাসের শব্দ আর দূরের কুকুরের ডাক।

প্ল্যাটফর্মের এক কোণে একটি বেঞ্চে বসে ছিল ইমরান। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ। ব্যাগে ছিল দুটি জামা, একটি পুরোনো ডায়েরি, আর মায়ের দেওয়া একটি তসবিহ।

সে কোথায় যাবে, তা নিজেও জানত না।

শুধু জানত—যেখানে আছে, সেখানে আর থাকতে চায় না।

জীবন যেন একের পর এক দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। চাকরি হারিয়েছে, ব্যবসায় লোকসান হয়েছে, যাদের আপন ভেবেছিল তারা সবাই ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে। সবচেয়ে কষ্টের ছিল—নিজের ওপর বিশ্বাসটাও হারিয়ে ফেলেছিল।

লাউডস্পিকারে ঘোষণা হলো—

"আজকের শেষ ট্রেন কয়েক মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে।"

ইমরান মাথা নিচু করে বসে রইল।

ঠিক তখনই পাশে এসে বসলেন এক বৃদ্ধ। সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর দাড়ি, হাতে একটি লাঠি।

বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন,

"বাবা, কোথায় যাবে?"

ইমরান মৃদু হেসে বলল,

"জানি না।"

বৃদ্ধও হেসে বললেন,

"যে জানে না সে কোথায় যাবে, তার জন্য পৃথিবীর সব পথই সমান।"

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

হঠাৎ বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি ছোট পাথর বের করে ইমরানের হাতে দিলেন।

পাথরটি খুব সাধারণ। কোনো দামি রত্ন নয়।

ইমরান অবাক হয়ে বলল,

"এটা দিয়ে কী করব?"

বৃদ্ধ বললেন,

"যখন মনে হবে তুমি একেবারে একা, তখন এটা হাতে নিয়ে ভাববে—এই পাথরও হাজার বছর ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে টিকে আছে। মানুষ কি পাথরের চেয়েও দুর্বল?"

ইমরান উত্তর দিতে পারল না।

ট্রেন এসে থামল।

মানুষ দ্রুত উঠে পড়ল।

ইমরানও উঠল।

বৃদ্ধকে খুঁজে ধন্যবাদ বলবে—এই ভেবে পেছনে তাকাল।

কিন্তু বেঞ্চটি খালি।

এত অল্প সময়ে তিনি কোথায় গেলেন?

পুরো প্ল্যাটফর্মে খুঁজেও তাকে আর পাওয়া গেল না।

ট্রেন ছেড়ে দিল।

জানালার পাশে বসে ইমরান সেই পাথরটির দিকে তাকিয়ে রইল।

পরদিন সকালে সে একটি ছোট শহরে নেমে গেল।

সেখানে একটি বইয়ের দোকানে অস্থায়ী কাজ পেল।

বেতন কম ছিল, কিন্তু বইয়ের গন্ধে তার মন ভালো হয়ে যেত।

প্রতিদিন শত শত মানুষ দোকানে আসত।

কেউ বই কিনত পরীক্ষার জন্য।

কেউ গল্প পড়ার জন্য।

কেউ আবার শুধু সময় কাটানোর জন্য।

ইমরান ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল—প্রতিটি মানুষের ভেতরেই একটি অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।

একদিন এক ছোট মেয়ে দোকানে এসে বলল,

"চাচা, এমন একটা বই দিন, পড়ে সাহস বাড়ে।"

ইমরান অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর দোকানের সবচেয়ে সস্তা বইটি তুলে দিয়ে বলল,

"বইয়ের দাম কম হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরের আলো অনেক বড়।"

বছর কেটে গেল।

ইমরান নিজের একটি লাইব্রেরি তৈরি করল।

সেখানে দরিদ্র ছাত্রদের জন্য বই পড়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

দরজার সামনে একটি ছোট বোর্ড টাঙানো ছিল—

"এখানে বই ধার নেওয়ার আগে একটি হাসি জমা দিতে হবে।"

মানুষ অবাক হতো।

কেউ জিজ্ঞেস করলে ইমরান বলত,

"হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো সময়সীমা নেই।"

এক বর্ষার সকালে লাইব্রেরিতে এক বৃদ্ধ এলেন।

তার চেহারা দেখে ইমরানের বুক কেঁপে উঠল।

তিনি কি সেই মানুষ?

না...

চেহারা আলাদা।

কিন্তু বৃদ্ধ একটি পাথর বের করে টেবিলে রাখলেন।

ঠিক একই রকম।

বৃদ্ধ বললেন,

"এই লাইব্রেরির কথা শুনে এসেছি। শুনেছি, একজন মানুষ এখানে মানুষের মনকে বইয়ের মতো খুলে পড়তে শেখায়।"

ইমরান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

"আপনি আমাকে চেনেন?"

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

"না। তবে যিনি তোমাকে পথ দেখিয়েছিলেন, তাঁকে চিনতাম।"

"তিনি কে ছিলেন?"

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

"তিনি কোনো বড়লোক ছিলেন না। কোনো বিখ্যাত মানুষও ছিলেন না। তিনি শুধু এমন একজন পথিক ছিলেন, যিনি নিজের জীবন ব্যয় করেছেন অন্যদের হার না মানতে শেখানোর জন্য।"

ইমরানের চোখ ভিজে উঠল।

সেই রাতের স্টেশন, শেষ ট্রেন, আর সেই পাথর—সব আবার মনে পড়ে গেল।

সে বুঝল, জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার সব সময় অর্থ বা সুযোগ নয়।

কখনো কখনো মাত্র কয়েকটি কথা, একটি ছোট্ট বিশ্বাস, অথবা একটি সাধারণ পাথরও একজন মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।

সেদিন রাতে লাইব্রেরি বন্ধ করার আগে ইমরান দরজার পাশে নতুন একটি বাক্য লিখে রাখল—

"যদি পথ হারিয়ে ফেলো, দৌড়াবে না। থেমে দাঁড়াও। অনেক সময় পথ আমাদের খুঁজে নেয়, যদি আমরা আশা হারিয়ে না ফেলি।"

বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছে।

ছাদের টিনে টুপটাপ শব্দ।

টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট পাথরটি নীরবে পড়ে আছে।

কেউ জানে না তার দাম কত।

কিন্তু ইমরান জানে—

পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলোর অনেকগুলোরই কোনো বাজারদর হয় না।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url