ইতিহাসের ৭ জন ভয়ংকর সুন্দরী নারী। জানলে আপনি চমকাতে বাধ্য হবেন || Beautyful woman
ইতিহাসের ৭ জন ভয়ংকর সুন্দরী নারী। জানলে আপনি চমকাতে বাধ্য হবেন || Beautyful woman
সেদিন অর্নবের এক বাক্যের একটা কথা আজও নিরার কানে বাজে। 'নিরা আমার বউ।' গত দু'বছরে তার জীবনে যে আমূল-পরিবর্তন এসেছে তার মাঝে অর্নবের সাথে কাটানো কিছু মুহূর্ত আজও তার মনে গেঁথে আছে। সময়ের নিয়মে অনেক মানুষ জীবনে আসে, আবার অনেকে চলেও যায়। এটাই জীবনের নিয়ম কিংবা এটাই মানুষের নিয়ম। না চাইতেও অনেক কিছু আমাদের মানতে হয়। যা ছাড়তে ইচ্ছে করে না। তাই ছেড়ে দিতে হয় নিঃশব্দে। এই যে এই মুহূর্তে নিরার চলমান জীবনের গতি যে দু'বছর আগের থেকে ঠিক উল্টো দিকে বইছে তা তো সে চায়নি। সে চায়নি বলেই যে জীবনের পরিবর্তন আসেনি এমনটাও তো নয়। সময়ের প্রয়োজনে সবকিছু ঠিক নিজের গতিতে চলতে থাকে।
সেদিন মায়ানের সাথে কলে কথা বলার পর। অর্নব খানিক সময়ের জন্য কেমন যেন চুপসে গিয়েছিল। পাশাপাশি অনেকটা পথ হাঁটার পরও একটি কথাও বলেনি। সেদিন সে কী অত ভেবেছিল নিরা জানে না। তার বারবার মনে হচ্ছিল মায়ান তার সাথে দেখা করতে চেয়েছে এটা বলে দেয়া দরকার। পরক্ষণেই সে ভাবল আগে দেখা করে মায়ানের কথা শুনবে তারপর অর্নবকে সবটা খুলে বলবে। নিরা তখন প্রথম কথা বলেছিল, "আপনারা বিয়ে করছেন কবে?"
অর্নব প্রশ্নটা শুনে চলার গতি থামিয়ে দিল। তার মুখটা তখন থমথমে, কপালের রেখাগুলো কুচকানো, চোখে বিস্ময়। অর্নব বলল, "কারা কবে বিয়ে করছে?"
নিরা তার চোখে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল, "আপনার আর দিয়া আপুর।"
অর্নব কিছু না বলে কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিরার মনে হচ্ছিল অর্নব তার মুখে সন্ধানী দৃষ্টিতে কিছু একটা খুঁজছিল। সে কিছু একটা কী সে জানে না। সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল। কিছু কিছু চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ভেতরটা কেমন যেন হিম হয়ে আসে। হৃদপিণ্ডটা কবুতরের সিনার মতো দূর্বল হয়ে আসে। নিরার তেমনটাই হয়। এই মানুষটার গাঢ় চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। মনে হয় তার ভেতরের যে তোলপাড় সে কোনো মুহূর্তে মুখের আদলে ফুটে উঠবে। সে ধরা পড়ে যাবে মায়া - মায়া চোখের চাহনিতে। যা সে কিছুতেই চায় না। যা হবে না তা ভেবে শুধু শুধু কেন কষ্ট পাবে।
অর্নব তার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল, "এখানে ঘুরতে এসেছি। এখন অন্তত এসব কথা থাক না নিরা।"
কথাটা বলার সময় তার গলার স্বরে যে দূর্বলতা সে দেখেছে সেই প্রথম এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়েছিল সামনে থাকা গাঢ় চোখের মানুষটা তার খুব কাছের, খুব আপন! কিন্তু সেদিন সে মুহূর্তে সে কী ভেবেছিল আজ তারা যোজন - যোজন দূরত্বে থাকবে!
★★★
হোটেলে ফিরে তারা যখন ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিল। তাদের দরজায় কড়া নড়ল। অর্নব দরজা খুলতেই দুটো ছেলে - মেয়ে হাসি হাসি মুখে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার বয়স সাতাশ-আটাশ হবে। মেয়েটার তেইশ - চব্বিশ হতে পারে। অর্নব সৌজন্যের হাসি হাসল। ছেলে - মেয়ে দুটো হেসে বলল, "আজ আমাদের ফার্স্ট এ্যানেভার্সেরি তাই রাতে হোটেলের সামনে এখানে যত কাপল আছে সবাইকে নিয়ে আড্ডা দিতে চাই। আশাকরি আপনারাও আসবেন। আমাদের দুজনের পক্ষ থেকে আপনাদের নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলাম। আপনাদের অপেক্ষায় থাকব। ততক্ষণে নিরা অর্নবের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই দম্পতি এতটাই হাসি - খুশি যে তাদের সচরাচর বারণ করা যায় না। অর্নব নিরার দিকে তাকাল যেন চোখে চোখে সম্মতি চেয়েছে। নিরা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লে সে বলল, " আমরা অবশ্যই আসব।"
দম্পতি হাসল। মেয়েটা বলল, "কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করি?"
অর্নব হাসিটা ধরে রেখেই বলল, "নিশ্চয়ই?"
"আপনাদের নতুন বিয়ে হয়েছে তাই না?" মেয়েটার কথা বলায় এমন একটা ভঙ্গি ছিল যে উপস্থিত সবাই না হেসে পারল না। অর্নব হেসে বলল, "আপনার ধারণা একদম সঠিক। "
তারা বিদায় নিয়ে চলে গেলে। দরজা বন্ধ করে দুজনে বিছানায় এসে বসে। নিরার ঠোঁটে তখনও মিষ্টি হাসি লেগেছিল। সে বলল, "কী সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটা তাই না?"
অর্নব নিরার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল তারপর বলল,"হয়তো।"
নিরা ভ্রুকুটি করে পাল্টা প্রশ্ন করল,"হয়তো কেন?"
"হয়তো এই জন্যই যে আমার কাছে অতটা আহামরি লাগেনি। তোমার কাছে ভালো লেগেছে আমার কাছে লাগেনি বলেই হয়তো বলেছি।"
নিরা খাটের পাশে ঝুলে থাকা পা দুটো বিছানায় গুটিয়ে বসে ঝগড়া করার ভঙ্গিতে বলল, "পুরুষ মানুষ এমনই। ঠিক মেয়েদের খুঁটিয়ে - খুঁটিয়ে দেখে বউয়ের সামনে এমন ভাব ধরে যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। যত্তসব ন্যাকামি।"
অর্নব নিরার এমন আচরণে চোখ বড় বড় করে তাকাল। ঠোঁট কামড়ে বলল, "তা সে যদি করেও থাকি তাতে তোমার কী সমস্যা বলো তো?"
নিরা তক্ষুনি ফোঁস করে উঠে বলল,"আমার কিছুই না। শুধু সত্যি কথাটা বলার সাহস নেই সেটাই মানতে পারছি না। অকারণে মিথ্যে বলার কী দরকার ছিল?"
নিরার এমন অদ্ভুত আচরণে অর্নবের বেশ মজা লাগছিল। সে তাকে আরও রাগানোর জন্য বলল, "কী যে বলো নিরা! আমি কেন তোমায় মিথ্যে বলতে যাব বলো তো?"
"একশো বার মিথ্যে বলেছেন। হাজার বার বলেছেন। পুরুষ জাতের এই একটা সমস্যা ঘরে যতই সুন্দরী বউ থাকুক বাইরে চুক চুক করবেই।"
" বাই দ্যা ওয়ে, তুমি কী নিজেকে সুন্দরী বলে দাবী করছো নিরা?"
"দাবী করার কী আছে! আমি তো সুন্দরীই!"
"তুমি কী নিজেকে আমার বউ বলে দাবী করছো নিরা?"
"দাবী করার কী আছে? আমি তো আপনার বউই!"
কথার পিঠে কথাটা বলে ফেলার পর নিরার মনে হলো এটা সে কী বলল! মনে মনে নিজেকে বলল কাঠখোট্টা ডক্টরের সামনে বোকামিটা কেন করলি নিরা? তোর আর বুদ্ধি হলো না।
অর্নব তখনও নিরার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে। তার দাম্ভিক অথচ সুন্দর হাসিটা। নিরা নিচের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। এমন সব পরিস্থিতিতে না সামনে বসে থাকা যায়। না হুট করে সামনে থেকে চলে যাওয়া যায়। সে এক অস্বস্তিকর অনুভূতি। যেন মাটি ফাঁক হোক, আর সে লজ্জা ডাকতে মাটির নিচে ঢুকে যাক। পরক্ষণেই তার মাথায় আবার একটা কথা এলো সে কী মনে মনে অবচেতন ভাবে নিজেকে অর্নবের বউ ভাবতে শুরু করেছে! নয়তো হুট করে এসব কেন বলবে! একজন মানুষ যখন অবচেতন ভাবে কিছু একটা ভাবে তখন তার অসতর্কতায় মুখ দিয়ে সেটা বেরিয়ে আসে। তারও কী তাই হয়েছে! যা সে সতর্ক অবস্থায় বলতে পারে না। তাই কী অসতর্ক অবস্থায় বলে ফেলেছে। নিজেকেই যেন নিজের কাছে অচেনা লাগল তার। সে জানে না ভালোবাসা কী! কেমন লাগে কাউকে ভালোবাসলে। জীবনের তেইশটি বসন্ত পার করলেও তার কাছে প্রেম নামক শব্দটি কোনো অসাধারণ অর্থ নিয়ে ধরা দেয়নি। তাই তার মনের কোণে আলগোছে কোনো একফাঁকে প্রেম নামক শব্দটি যে ঢুকে পড়েছে সে বুঝতেই পারেনি।
অর্নবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন নিরার দিকে। সে ভাবছে তাকে কী নিরা ভালোবাসে? নয়তো এমন কথা কেন বলেছে? নাকি মেয়েদের স্বভাবটাই এমন। নিজের স্বামীকে অন্য কোনো নারীর সাথে হেসে কথা বলতে দেখলেই তাদের ভেতরে হিংসা জেগে উঠে। শুধু কী এ স্বভাব সুলভ আচরণের জন্যই নিরা এমন করেছে! কিন্তু এ স্বভাব বোধটার জন্যও তো কাউকে আগে ভালোবাসার দরকার। যদি কাউকে ভালোই না বাসে। তবে হিংসাটা আসবে কোথায় থেকে! নিরা তাকে ভালোবাসে এটা ভাবতেই তার মানসলোকে স্নিগ্ধ ও নির্মল অনুভূতি আলতোভাবে দোলা দিয়ে গেল। যেন জীবনে প্রথম এমন এক অনুভূতির সাথে সে পরিচিত হলো যার হদিস এতদিন কোথায় সে পায়নি। কিছুতেই সে এ প্রগাঢ় অনুভবকে কোনো কিছুর বিনিময়ে হারিয়ে ফেলতে নারাজ।
বর্তমান
নিরা বসে বসে অতীতের স্মৃতিচারণ করছিল। নিজের জীবনের অসংখ্য খারাপ স্মৃতি থেকে কুড়িয়ে আনা এ সুন্দর মুহূর্তগুলো তাকে অবসরে শান্তি দেয়, কিন্তু স্বস্তি দেয় না। কারণ এ শান্তিটার সাথে স্বস্তির কোনো যোগাযোগ নেই। মানুষের এমন কিছু অনুভূতি আছে যা একসাথে শান্তি ও স্বস্তি দুটো দিতে পারে না। তার মধ্যে অন্যতম সুখের স্মৃতি কিংবা ভালোবাসা। মানুষ যখম ভালোবাসার মানুষের কাছাকাছি থাকে, তখন যে সুখটা তার ভেতরে বিরাজ করে তা কখনো স্বস্তি দিতে পারে না। নিরার মনে হচ্ছে অতীতের স্মৃতি তাকে অবসরে শান্তিটা দিলেও তার সাথে সাথে তা আবার ফিরে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা চিত্তে অস্বস্তি নিয়ে আসে। যা সেই শান্তিটুকুও কেড়ে নেয়।
নিরা অন্যমনস্ক হয়ে এসব ভাবতে ভাবতে কারো কথায় তার সম্বিৎ ফেরে। কেউ তাকে বলছে, "হেই লিরা? হোয়াটসঅ্যাপ?"
নিরা অস্ফুটে বলল, "ইউ?"
রাতের আঁধার কেটে সোনালী আভায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবী। জানালা গেলে রোদের ঝিলিক মুখে পড়তেই ঘুম ভেঙে যায় অর্নবের। ঘুম ভাঙলে আজও সেই সব দিনগুলোর মতো পাশ ফিরে প্রথমে নিরাকেই দেখতে চায়। যখনই তার পাশের বালিশটা খালি পড়ে আছে দেখে, তখনই তার ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়। চোখের মুখে স্পষ্ট ব্যাথার রেখা ফুটে উঠে। বুকের ভেতর বয়ে চলে সমুদ্রের জোয়ার। যা শুধু কেড়ে নিতে জানে, কাউকে কিছু দিতে জানে না।
দু'বছর পার হয়ে যাবার পরও আজও তার মনে হয় কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখবে তার পাশে গুটিশুটি হয়ে আদুরে একটা মেয়ে ঘুমাচ্ছে। তার ফর্সা নরম আদুরে গালে রোদের ঝিলিক খেলা করেছে তা দেখে দিন শুরু করতে তার ভীষণ ভালো লাগত। মনে হতো একটা সুখ, সুখ অনুভূতি তার সারাটাদিন হেসে খেলে কাটিয়ে দেয়ার শক্তি দিত। আজও ঠিক সকাল হয়। নিয়ম অনুযায়ী সে পাশ ফিরেও দেখে কিন্তু এখন আর তার নিজের মানুষটাকে দেখতে পায় না। শুধু মনে হয় তার ভেতরটা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। নিশ্বাসের গতি কমে আসছে। সে জানে হয়তো এভাবেই একদিন তাকে মরে যেতে হবে।
ফ্রেশ হয়ে অর্নব হাসপাতালে চলে যায়। নিরা যাওয়ার পর থেকে খুব একটা বাসায় নাস্তা করে না। প্রথম প্রথম দিদান জোর করে একটু - আধটু খাইয়ে দিত। নিরা চলে যাওয়ার পর দিদানও ধীরে ধীরে বিছানায় পড়ে গেলেন। শরীরের যন্ত্রগুলো দিনদিন অকেজো হয়ে ধরা দিচ্ছে। আজকাল উনার নিজের খাবারেই অনিহা। বিছানায় শুয়েও অর্নবের জন্য চিন্তা করেন। প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছেন আবার তাকে বিয়ে দিতে। নিরাকে ছাড়া যে উনার নাতি ভালো থাকবে না। তা তিনি ভালো করেই জানতেন।তারপরও মনে মনে ভাবতেন নিরা ফিরে আসুক। নিরার মতো ভালো বউ আর পাবে না অর্নব। কিন্তু সময় চলে গেছে নিরার ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং যে ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল আজকাল সেটুকুর পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
অর্নবের মা ছেলের চিন্তায় দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নিরার চলে যাওয়ায় তার কষ্টও কম হয়নি। তিনি ভাবেন মেয়েটার মাঝে অদ্ভুত এক শক্তি আছে। যার দ্বারা মানুষকে মায়ার বাঁধনে খুব সহজেই বেঁধে ফেলে। কিন্তু আমরা না চাইলেও তো অনেক কিছুই ঘটে যায়
★★★
কিয়ারার সাথে বসে আছে নিরা আরেক মগ কফিতে চুমুক দিচ্ছে। কিয়ারা কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল, "লিরা তোমার কী মন খারাপ?"
নিরা হেসে বলল, "একটুখানি কিয়া। কিন্তু তুমি এত তাড়াতাড়ি আসবে বলোনি তো?"
কিয়ারা নিরার রুমমেট। তারা একসাথে থাকে। গতমাসে কিয়ারার বাবা মারা যাওয়ায় সে মায়ের কাছে দু'মাস থাকবে বলে গিয়েছিল। কিন্তু মাস গড়াতেই সে যে চলে আসবে এটা জানত না নিরা। কিয়ারাকে ভালোবেসে নিরা কিয়া বলে ডাকে। কিয়ারা নিরা শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে না। তাই তাকে লিরা বলেই ডাকে।
নিরার প্রশ্ন শুনে কিয়ারা হাসল। বলল, "আমি ভেবেছি তুমি একা আছো। তাই চলে এলাম। তাছাড়া আমার মা এখন ভালো আছেন। তাই দেরি না করে চলে এলাম।"
টেবিলের উপর রাখা কিয়ারার হাতের উপর হাত রেখে নিরা বলল, "তুমি অনেক ভালো কিয়া। এখানে তুমি আমার যেমন খেয়াল রাখো, আর কেউ হয়তো পারবে না।" কিয়ারা হেসে তার ফোনে একটা গান চালু করল। গানটা খুব জনপ্রিয়। 'ইউ আর মাই এভরিথিং!"
আচমকা গানটার মুখরাটা কানে যেতেই নিরার মনে বিষন্নতার বৃষ্টি নামল। ফিরে গেল সেই সোনালী অতীতে। এক টুকরো স্নিগ্ধ স্মৃতিতে।
সেদিন হোটেলে এক দম্পতি তাদের দাওয়াত দেয়ার পর তারা সেখানে গিয়েছিল। নিরার পরনে নীল সুতি শাড়ি ছিল। শাড়ির উপর লং জ্যাকেট। নিরাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। দুজনে পাশাপাশি হেঁটে যখন সেখানে পৌঁছাল। তখনই সাথে সাথে সবাই তাদের স্বাগত জানাল। মোস্ট বিউটিফুল কাপল হিসেবে তারা সেদিন অনেক নাম আখ্যা দিল। শীতের রাতে কাঠ জ্বালিয়ে সে কাঠের চারপাশে গোল হয়ে সব কাপল বসেছিল। পাশে ব্যাকগ্রাউন্ডে 'ইউ আর মাই এভরিথিং' গানটা চলছিল। সে গানের সাথে সবাই ঠোঁট মেলাচ্ছিল। শুধু নিরার ভেতরে অস্বস্তি কাজ করছিল। এ গানের প্রতিটি লিরিকের সাথে সাথে তার ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠেছিল।
তার খুব মন চাচ্ছিল এমন একটা গানের প্রতিটি শব্দে কাউকে খুঁজুক। কাউকে ভেবে হৃদয় রোমাঞ্চিত হোক। এবং সেদিনই প্রথম সে নতুন এক অনুভূতির সাথে পরিচিত হয়েছিল। চোখ বন্ধ করে যখন সে কাউকে অনুভব করতে চাইল তখন একটা ছবি তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। যখনই সে ছবিটি দেখল। তখনই চোখ খুলে পাশে বসা মানুষটির দিকে ভালো করে তাকাল। একে একে সব মিলিয়ে দেখল। এবং বুঝল তার মানসলোকের চিত্রটির সাথে তার পাশে বসে থাকা মানুষটির হুবহু মিল। সেই তীক্ষ্ণ নাক, গাঢ় চোখ, অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। সেদিন সে বুঝেছিল তার মনের কোণে অর্নবের জন্য ভালোবাসা জায়গা করে নিয়েছে। তাও সে বিশ্বাস করতে চাইল না। সে জানে কিছুদিন পর তাকে চলে যেতে হবে। যেখানে মায়া করে লাভ হয় না। সেখানে মায়া কাটাতে শিখতে হয়। সেও তাই মনের এই পাগলামিকে পাত্তা দিল না। ক্ষণিকের ভালো লাগা বলে নিজেকে মানাতে চাইল।
গানটা চলাকালীন দুজনের বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হয়ে গেল। দুজনের চোখে কুণ্ঠা, মনে অস্বস্তি। চেয়েও কেউই স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছিল না। জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন খুব স্মার্ট মানুষকেও বোকা মনে হয়। তাদেরও তেমনটাই মনে হচ্ছিল। হয়তো নিজেদের মনের দ্বিধাকে সরাতে পারছিল না। কিংবা দুজনেই ভাবছিল মুখ খুললেই হয়তো দুজন দুজনের কাছে ধরা পড়ে যাবে। এভাবে অনেকটা সময় কেটে গেল। গান থামার পর একটু স্বাভাবিক হলো। গান শেষ হলে সেখানে একটা খেলার আয়োজন করা হলো। খেলাটা এরকম যে একটা ঝুড়িতে কতগুলো কাগজ ভাঁজ করা থাকবে। সব দম্পতি এক টুকরো কাগজ উঠিয়ে নেবে। এবং সে কাগজে যা লেখা থাকবে তাদের তাই করতে হবে।
অর্নব নিরা কিছুটা ঘাবড়ে গেল এটা শুনে। কাগজে কী না কী লেখা থাকে দুজনে - দুজনের দিকে তাকাতেই মনের ভাষা বুঝে গেল। তারা এ খেলার হোস্ট হবে বলে কাটাতে চাইল। কিন্তু নীল-তাঁরা দম্পতি তা শুনলো না। আজ যাদের বিবাহ বার্ষিকী তাদের নাম নীল- তাঁরা। অগত্যা নিরাদের খেলতেই হলো। একে - একে মোট নয় দম্পতি তাদের লটারিতে উঠা কাজ সম্পন্ন করল। সবার শেষে নিরাদের পালা এলো। ভয়ে ভয়ে কাগজ উঠিয়ে সেটা খুলে দুজনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। নিরা ঠোঁট খিচিয়ে মাথা দোলাল। কিন্তু তাঁরা এসে খপ করে নিরার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে সিটি বাজিয়ে বলল, "লেটস স্টার্ট মোস্ট বিউটিফুল কাপল!"
নিরা অর্নবের দিকে বোকার মতোন চেয়ে আছে। এ মুহূর্তে তার মাথায় একটা কথাই আসছে 'নো ওয়ে।' কিন্তু সে কথাটা মুখে আনতে পারল না। নীল যখন কাগজটি জোরে পড়ে শোনালো সবাই শিস দিয়ে তাড়াতাড়ি করতে বলল। অর্নব নিরার এ মুহূর্তে এদের ডিমান্ড পূরণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এখন যদি তারা তা না করে তবে সবাই ভাববে এরা বিবাহিত না। এবং অবিবাহিত হওয়ার পরও দুজন একটা হোটেলে রাত কাটাচ্ছে। এতে বরং ঝামেলা বাড়বে বৈ কমবে না। তাই অর্নব ধীরে ধীরে নিরার দিকে এগিয়ে আসল। নিরা তখন হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে তাকিয়ে রইল অর্নবের পথের দিকে। উৎসুক জনতার দৃষ্টি তাদের দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে নিরার সামনে এসে দাঁড়াল। নিরার চোখে মুখে আতঙ্ক। সে কিছু বলতে যাবে এমন সময় অর্নব তার অধরে গাঢ় চুমু খেল। নিরা নিজের অজান্তেই চোখ বুজঁল। আশেপাশে তখন করতালির শব্দ, অথচ এর কিছুই কানে তাদের যাচ্ছে না। অর্নব যখন নিরাকে ছাড়ল তখন নিরার মস্তিষ্ক শূন্য, মুখে রক্ত জমাট বেঁধেছে। চোখে বিস্ময়! অর্নবের মুখও তখন আরক্ত। সে নিজের জানে না এমন একটা কাজ কেন করল। এ মুহূর্তে ভুল ঠিক কিছুই তার মাথায় নেই। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিম স্রোত তখনও বেয়ে নামছে। শুধু মনে হচ্ছে সে কোনো অলীক জগতে আছে। বাতাসে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ তখনও উড়ে বেড়াচ্ছিল। সেটা কী নিরার শরীরের ঘ্রাণ! তা ভেবেই তার ভেতরটা রোমাঞ্চিত হলো। সে জানে না কেন তার মধ্যে তখন কোনো খারাপ লাগা কাজ করছিল না। মনে হচ্ছিল চারপাশে বসন্ত নেমেছে। সুক্ষ্ম অথচ তীব্র একফাঁলি প্রগাঢ় অনুভব তার হৃদ মাঝারে বয়ে যাচ্ছিলো। এমন সুন্দর, সুখী অনুভূতি জীবনের প্রথম সে পেল। চারদিকে মানুষের ঠাট্টায় যখন তার সম্বিৎ ফেরে, তখন দেখল নিরা তার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নিরা হনহনিয়ে রুমে চলে গেল। তখনই একটা ভয় তার ভেতরে রক্ত জমাট করল। নিরা তাকে কী খারাপ ছেলে ভাবছে!
নীল তখন তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, "ভাবী বোধহয় লজ্জা পেয়েছে। তাই রুমে চলে গেল। আসলে বাংলাদেশের মেয়েদের লজ্জা আসলে একটু বেশি। তবে আপনাদের পারফর্মেন্স ভালো ছিল। এই যে দেখুন আমি ছবি তুলে রেখেছি। আপনাকে পাঠিয়ে ডিলিট করে দেব। ভাবলাম এমন একটা মুহূর্ত আপনাদের নিশ্চয়ই সারাজীবন মনে থাকবে।"
অর্নব তার ফোন থেকে ছবিগুলো নিল। এবং নীল তার সামনেই ছবিগুলো ডিলিট করল। সবার থেকে বিদায় নিয়ে যখন রুমের দিকে পা বাড়াল তখন তার ভয় করছে। নিরাকে কীভাবে ফেইস করবে সেটা ভেবে বুক হিম হয়ে আসছিল। নিরা যদি তাকে বাজে ছেলে ভেবে অপমান করে তবে সে কীভাবে তার সামনে যাবে। নানা ভাবনায় সে যখন রুমে আসল তখন দেখল নিরা কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। শুধু একটা চোখ দেখা যাচ্ছে। সে চোখের কোণে জলের দাগ স্পষ্ট। তারমানে নিরা কাঁদছে! তার জন্য নিরা কাঁদছে এটা ভাবতেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইল।
নিরাকে অনেকবার ডাকতে চেয়েও অর্নব পারেনি। তার ভয় হচ্ছিল যদি নিরা তাকে যা তা বলে অপমান করে! তবে সে সইতে পারবে না। সে রাত অর্নব বারান্দায় কাটিয়েছে। কয়েকবার নিরাকে দেখে গেছে। কিন্তু তার পাশে ঘুমানোর সাহস পায়নি। সকালে যখন তার ঘুম ভাঙে তখন দেখে নিরা তার সামনে চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে সে বলল, "তুমি?"
"হ্যাঁ আমি। এ ঘরে কী আমি ছাড়া আর কেউ থাকার কথা ছিল?" নিরা ভ্রুকুচকাল।
অর্নব উঠে বসে বলল, "না তা নয়। কিন্তু চা কোথায় পেলে?"
"হোটেলের বয় এসে দিয়ে গেছে। এই নিন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"
অর্নব চা নিল। নিরাকে বেশ সহজ দেখাচ্ছে। রাতের বিষয়ে যেন কিছুই তার মনে নেই এমন ভাব দেখাচ্ছে। অথচ সে ভেবেছিল নিরা তাকে ছোট বড় কথা শোনাবে। কিন্তু এমন কিছু হলো না দেখে অবাক হয়েছিল। মনে মনে অবশ্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
আজ যখন কিয়ারা সেই গানটা বাজাল নিরার সেদিনের কথা মনে পড়ে গেছে। সেদিন সেই অনুভূতি তার পাত্তা না পেলেও কিংবা ঝাপসা থাকলেও আজ সবকিছু স্পষ্ট। বরং স্বচ্ছ জলের মতো স্পষ্ট। আজকে তার সেই অনুভূতি এতটাই ফুলেফেঁপে উঠেছে যে আজ তার পাত্তা দেয়া, না দেয়া কিছু আসে, যায় না। তার মনে অর্নব এতটাই গেড়ে বসেছে যে ঘুম থেকে উঠা থেকে ঘুমাতে যাওয়ার সময় পর্যন্ত তার মনে থাকে। এমনকি ঘুমের ঘোরেও এ মানুষটাকে খুঁজে ফেরে সে। তাতে অবশ্য লাভ বিশেষ কিছুই হয় না। শুধু এক আকাশ শূন্যতাই পায়। এমন উন্নত দেশে থেকেও তার মন শুধু সে গত হওয়া সময়গুলোকে পেতে চায়। সেদিন অর্নবের ঘাবড়ে যাওয়া তার চোখ এড়ায়নি। তাই তাকে অস্বস্তিতে না ফেলতে রুমে চলে এসেছিল। রুমে এসে খুব কেঁদেছিল। কিন্তু সেটা দুঃখের অশ্রু ছিল না। তার নারী জনমে প্রথম কোনো পুরুষের স্পর্শ পেয়েছিল বলে এতটুকু খারাপ লাগেনি। একটা অজানা অচেনা ভালো লাগার অনুভূতি তার ভেতরটা ছেয়ে গেল। এবং সে বুঝতে পারল সে অর্নবকে ভালোবাসে। তাই ভালোবাসার প্রগাঢ় স্পর্শ তাকে সম্পূর্ণ নতুন এক অনুভূতির সাথে পরিচয় করাল। আজও তার কাছে সেদিনের দৃশ্যটা জীবন্ত। তার আট মাসের দাম্পত্যের এটুকুই ছিল স্বামী - স্ত্রীর পাওয়া। আজ তার মনে হয় এটাই ছিল য়ার নারী জনমে প্রথম চুমু, ও পুরুষের প্রথম স্পর্শ। যা মনে হলে আজও তার হৃদযন্ত্রটা কেঁপে ওঠে।
তার অন্ধকার জীবনে কিছু সুখের স্মৃতির মধ্যে এটিই অন্যতম।